খুলনা প্রতিনিধি, দৈনিক স্বাধীন সংবাদ
৮ই জানুয়ারি ২০২৬
খুলনা নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত মাথাভাঙ্গা মৌজায় দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ৩২টি দরিদ্র পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মুখে। তাদের বসতভিটা জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে। এই চক্র ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব পরিবারের জমি দখলের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। দীর্ঘকাল ধরে এই এলাকায় বসবাস করা এসব পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা কোনো আইনি নোটিশ ছাড়াই হুমকি-ধমকির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে।
মাথাভাঙ্গা মৌজা খুলনা শহরের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে বেশিরভাগ বাসিন্দাই নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, কেউবা ছোটখাটো ব্যবসায়ী। অনেকে প্রজন্ম ধরে এখানে বসবাস করছেন। তাদের দাবি, এই জমিগুলোতে তারা দীর্ঘদিনের দখলীয় স্বত্বের ভিত্তিতে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’ নামধারী একটি গ্রুপের লোকজন এসে জমি তাদের বলে দাবি করছে এবং উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের একজন, মো. আব্দুল জলিল (৫৫) বলেন, “আমরা এখানে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে থাকি। আমার বাবা-দাদার আমল থেকে এই জমিতে ঘর করেছি। কোনো কাগজপত্র নেই ঠিকই, কিন্তু দখল তো আমাদের। হঠাৎ কয়েক মাস আগে কিছু লোক এসে বলে, এটা ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজের জমি। তারা আমাদের ঘর ভাঙতে চায়। আমরা কোথায় যাব? আমাদের তো আর কোনো জায়গা নেই।”
অন্য এক ভুক্তভোগী নারী, রহিমা বেগম (৪৮) জানান, “আমার স্বামী মারা গেছে। তিন সন্তান নিয়ে এই টিনের ঘরেই থাকি। এখন তারা বলছে, জমি ছাড়তে হবে। কয়েকদিন আগে কিছু লোক এসে ধাক্কাধাক্কি করেছে। আমরা পুলিশে অভিযোগ করতে গিয়েছি, কিন্তু ভয়ে করিনি। কারণ এরা প্রভাবশালী।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় কাজ করছে। তারা জাল দলিল তৈরি করে বা পুরনো রেকর্ডের অসঙ্গতি কাজে লাগিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর জমি দখলের চেষ্টা করছে। খুলনায় ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে শহরের উপকণ্ঠে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার উত্থানের সাথে সাথে এ ধরনের দখলবাজির ঘটনা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ডেভেলপার কোম্পানি বা ব্যক্তিরা দরিদ্রদের জমি কম দামে কিনে নেয় বা জোর করে দখল করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলে।
খুলনা জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, মাথাভাঙ্গা এলাকায় ভূমি-সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’ নামক কোনো নিবন্ধিত কোম্পানির সঠিক তথ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মৌজার অনেক প্লটের রেকর্ড অসম্পূর্ণ বা পুরনো। স্বাধীনতার আগে এবং পরে ভূমি সংস্কারের ফলে অনেক জমির মালিকানা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ভূমিদস্যুরা এই ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে দখলের চেষ্টা করে।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শাহিন আলম বলেন, “আমি এই অভিযোগ শুনেছি। ভুক্তভোগীরা আমার কাছে এসেছেন। আমি প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি। এ ধরনের দখলবাজি বন্ধ করতে হবে। দরিদ্র মানুষদের বসতভিটা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট ফরিদা ইয়াসমিন জানান, “খুলনায় ভূমি দখলের ঘটনা নতুন নয়। প্রতি বছর শত শত পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়। এর পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী চক্র। সরকারের উচিত দ্রুত তদন্ত করে এসব পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া। অন্যথায় সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে।”
ভুক্তভোগীরা জানান, তারা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা দাবি করছেন— তাদের দখলীয় স্বত্ব স্বীকার করে জমির মালিকানা নিশ্চিত করা হোক এবং ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এছাড়া, তারা স্থানীয় সাংসদ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
বাংলাদেশে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ একটি জাতীয় সমস্যা। পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশের আদালতে মোট মামলার প্রায় ৬০ শতাংশই ভূমি-সংক্রান্ত। খুলনা বিভাগে এই হার আরও বেশি। শহরায়নের চাপে কৃষিজমি ও বসতভিটা দ্রুত হাতবদল হচ্ছে। দরিদ্র পরিবারগুলো প্রায়শই আইনি লড়াইয়ে হার মানে কারণ তাদের কাছে কাগজপত্র থাকে না বা আর্থিক সামর্থ্য থাকে না।
এই ঘটনা খুলনার ভূমি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা, দখলীয় স্বত্বের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানা গেছে, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হবে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, কোনো অবৈধ দখল বরদাশত করা হবে না। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে তারা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হবেন।
এই ৩২টি পরিবারের ভাগ্য এখন প্রশাসনের হাতে। তাদের বসতভিটা রক্ষা পাবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। খুলনার এই ঘটনা শুধু স্থানীয় নয়, এটি দেশের ভূমি অধিকারের একটি বড় চিত্র তুলে ধরছে। দরিদ্র মানুষের অধিকার রক্ষায় সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
Leave a Reply